**ভূমিকা**
ভারত একটি বৈচিত্র্যময় দেশ, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ একসাথে বসবাস করে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে—পরবর্তী জনগণনায় বর্ণভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া শ্রেণির উন্নয়নের জন্য নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।
এই নিবন্ধে আমরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব:
1. **জনগণনা ও বর্ণভিত্তিক জরিপ কী?**
2. **বর্ণভিত্তিক জরিপের প্রয়োজনীয়তা**
3. **ইতিহাসে বর্ণভিত্তিক জরিপ**
4. **বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তের পটভূমি**
5. **বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া**
6. **সামাজিক প্রভাব**
7. **আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা**
8. **চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা**
9. **বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণ**
10. **ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা**
**১. জনগণনা ও বর্ণভিত্তিক জরিপ কী?**
**জনগণনা** হলো একটি দেশের জনসংখ্যা, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষার হার, বাসস্থান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া। ভারতে প্রতি ১০ বছর অন্তর জনগণনা করা হয়, যার শেষটি হয়েছিল ২০১১ সালে।
**বর্ণভিত্তিক জরিপ** হলো জনগণনার একটি অংশ, যেখানে বিভিন্ন বর্ণ বা জাতি (Caste) ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এটি সরকারকে বুঝতে সাহায্য করে যে কোন সম্প্রদায় শিক্ষা, চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে এবং তাদের জন্য বিশেষ প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন।
**২. বর্ণভিত্তিক জরিপের প্রয়োজনীয়তা**
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণি (SC/ST/OBC)দের জন্য সংরক্ষণ ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অনেক নতুন গোষ্ঠীও পিছিয়ে পড়ছে, যাদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য নেই। বর্ণভিত্তিক জরিপের মাধ্যমে:
- **সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে:** বর্তমানে OBC (অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণি)দের সংখ্যা ও অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য নেই। ২০১১ সালের জনগণনায় শুধু SC/STদের তথ্য নেওয়া হয়েছিল।
- **ন্যায্য নীতি প্রণয়ন:** সরকার জানতে পারবে কোন সম্প্রদায়ের কী ধরনের সহায়তা দরকার।
- **রাজনৈতিক দাবি মেটানো:** অনেক রাজ্য ইতিমধ্যেই নিজস্ব বর্ণ জরিপ করেছে (যেমন বিহার)। কেন্দ্রীয় জরিপ হলে দেশব্যাপী একটি সমন্বিত নীতি নেওয়া সম্ভব হবে।
**৩. ইতিহাসে বর্ণভিত্তিক জরিপ**
- **ব্রিটিশ আমল:** ১৮৮১ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা বর্ণভিত্তিক জনগণনা করত।
- **স্বাধীনতার পর:** ১৯৫১ সালের পর থেকে শুধু তফসিলি জাতি (SC) ও উপজাতি (ST)দের তথ্য নেওয়া হয়। OBCদের তথ্য নেওয়া হয়নি।
- **মন্ডল কমিশন (১৯৮০):** OBCদের জন্য ২৭% সংরক্ষণের সুপারিশ করেছিল, কিন্তু তখনও সঠিক তথ্যের অভাব ছিল।
- **২০১১ সালের জনগণনা:** তৎকালীন UPA সরকার বর্ণভিত্তিক তথ্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু পরে তা প্রকাশ করা হয়নি।
**৪. বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তের পটভূমি**
২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন রাজ্য (বিহার, ওড়িশা, তেলেঙ্গানা) নিজস্ব বর্ণ জরিপ শুরু করেছে। বিহারের জরিপে দেখা গেছে যে রাজ্যের ৬৩% মানুষ OBC ও EBC (অতি পিছিয়ে পড়া শ্রেণি)। এই তথ্য চাপ সৃষ্টি করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর।
২০২৩ সালে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেয় যে ২০২৪-২৫ সালের জনগণনায় বর্ণভিত্তিক তথ্য নেওয়া হবে। এটি একটি বড় পরিবর্তন, কারণ গত ৭০ বছরে শুধু SC/STদের তথ্য নেওয়া হতো।
**৫. বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া**
- **সমর্থন:**
- **RJD, JDU (বিহার):** দীর্ঘদিন ধরে বর্ণ জরিপের দাবি করছে।
- **কংগ্রেস:** UPA সরকার ২০১১ সালে জরিপ করলেও তথ্য প্রকাশ করেনি, কিন্তু এখন তারা সমর্থন করছে।
- **বামপন্থী দলগুলো:** তারা মনে করে এটি সামাজিক ন্যায়বিচার বাড়াবে।
- **বিরোধিতা:**
- **কিছু BJP নেতা:** তাদের মতে, এটি সমাজে বিভেদ তৈরি করতে পারে।
- **উচ্চবর্ণের গোষ্ঠী:** তারা ভয় পাচ্ছে যে সংরক্ষণের পরিমাণ বাড়তে পারে।
**৬. সামাজিক প্রভাব**
- **ইতিবাচক:**
- পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের সঠিক চিত্র উঠে আসবে।
- শিক্ষা ও চাকরিতে ন্যায্য বণ্টন সম্ভব হবে।
- **নেতিবাচক:**
- কিছু গোষ্ঠী মনে করে এটি সমাজে বিভেদ বাড়াবে।
- রাজনৈতিক দলগুলো বর্ণভিত্তিক ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করতে পারে।
**৭. আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা**
সঠিক তথ্য থাকলে সরকার নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে পারবে:
- OBC ও EBCদের জন্য বাড়তি সংরক্ষণ।
- বিশেষ শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প।
- গ্রামীণ উন্নয়নে টার্গেটেড সহায়তা।
**৮. চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা**
- **তথ্য সঠিকতা:** বর্ণভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ জটিল, কারণ ভারতে হাজার হাজার উপ-বর্ণ আছে।
- **রাজনৈতিক অপব্যবহার:** কিছু দল এটিকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
- **সামাজিক উত্তেজনা:** উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে পারে।
**৯. বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণ**
- **মালয়েশিয়া:** বুমিপুত্রাদের (স্থানীয় মালয়) জন্য বিশেষ সুবিধা আছে।
- **যুক্তরাষ্ট্র:** আদমশুমারিতে জাতিগত তথ্য নেওয়া হয়, যা নীতিনির্ধারণে সাহায্য করে।
**১০. ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা**
যদি এই জরিপ সঠিকভাবে করা হয়, তাহলে এটি ভারতের সামাজিক ন্যায়বিচারের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হবে। তবে, এটিকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে এবং তথ্য যেন স্বচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
**উপসংহার**
মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা দেশের পিছিয়ে পড়া শ্রেণিগুলোর উন্নয়নে সাহায্য করবে। তবে, সঠিক বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এটি সফল হবে না। জনগণনায় বর্ণভিত্তিক তথ্য যুক্ত হলে ভারত আরও সমতামূলক সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাবে।
